খুলনা ব্যুরোঃ
২৪ ঘণ্টা যৌথ অভিযান ও এক মাসে ৭টি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার; তবুও কাটছে না নগরবাসীর আতঙ্ক খুলনা: অপরাধের স্বর্গরাজ্য ভেঙে দিয়ে খুলনাকে একটি নিরাপদ ও মাদকমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে পুলিশ ও র্যাব। সন্ত্রাস, মাদক ও সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ দমনে নগরীর ৩১টি ওয়ার্ডসহ সার্বিক এলাকায় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পরিচালিত হচ্ছে চিরুনি অভিযান। গত এক মাসে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি চিহ্নিত একাধিক সন্ত্রাসীকে আইনের আওতায় এনেছে যৌথ বাহিনী। তবে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড ও মাদক কারবারের মূলোৎপাটন না হওয়ায় জনমনে এখনো রয়ে গেছে এক অজানা আতঙ্ক।
গত ২ আগস্ট খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোঃ সাজ্জাদুর রহমান। দায়িত্বভার গ্রহণের পরপরই নগরীতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং কৌশলগত অভিযানে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়।
তবে পুলিশের এই কঠোর অবস্থানের মাঝেই নগরীতে কয়েকটি নির্মম ও চাঞ্চল্যকর অপরাধ সংগঠিত হয়। গত ১৯ আগস্ট লবণচরা থানার আশিবিঘা এলাকায় মাত্র তিন ঘণ্টার ব্যবধানে নাজমুল ও মঞ্জুরুল ইসলাম নামের দুই যুবককে নৃসংসভাবে হত্যা করা হয়। এর আগে ১৮ আগস্ট নগরীর রায়েরমহল এলাকা থেকে চার বছরের শিশু মিমকে অপহরণের অভিযোগে রাজু নামে এক যুবককে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। এছাড়া ২৬ আগস্ট টুটপাড়া এলাকায় প্রতিপক্ষের গুলিতে মামন মীর নামে এক যুবক গুরুতর আহত হন।
পর পর ঘটে যাওয়া এসব সহিংস ঘটনার পর পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়।
কেএমপি কমিশনার মোঃ সাজ্জাদুর রহমান জানান, “দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই আমরা অপরাধ দমনে গতানুগতিক কৌশলে পরিবর্তন এনেছি। এর সুফলও মিলতে শুরু করেছে। বিশেষ অভিযানের অংশ হিসেবে গত এক মাসেই নগরী থেকে ৭টি অবৈধ বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, গত ২৬ আগস্ট টুটপাড়ায় মামুন মীরকে গুলি করার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দারোগাপাড়া এলাকা থেকে ৩টি বিদেশি পিস্তল, তাজা গুলি ও বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সাথে গোয়েন্দা কার্যক্রমকে গতিশীল করতে কেএমপির দুজন সহকারী পুলিশ কমিশনারকে (এসি) ডিবি’র বিশেষ দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রাজধানী ঢাকা থেকেও চারজন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে কেএমপি। পরে তাদের দেওয়া তথ্যে নগরীর সোনাডাঙ্গা থেকে ১টি বিদেশি পিস্তল, ১টি রিভলবার ও গুলি জব্দ করা হয়। পুলিশ কমিশনারের দাবি, কঠোর পদক্ষেপের ফলে নগরীতে হত্যাকাণ্ড ও মাদকের প্রভাব দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পেয়েছে।
সুন্দরবনে যৌথ বাহিনীর বড় সাফল্য: ৫৯ দস্যুর আত্মসমর্পণ
কেবল নগরীই নয়, সুন্দরবনকে জলদস্যু ও বনদস্যুমুক্ত করতে যৌথ অভিযানে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করেছে র্যাব-৬। গত ৩১ আগস্ট র্যাবের কাছে সুন্দরবনের ৫টি বাহিনীর প্রধানসহ মোট ৫৯ জন দস্যু আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এ সময় তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা দেয়।
র্যাব-৬ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোঃ নিস্তার আহম্মেদ জানান, গত ২ মার্চ থেকে সুন্দরবনে শান্তি ফেরাতে কোস্ট গার্ড, পুলিশ, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘রি-স্টার্ট পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। এই ধারাবাহিক অভিযানে ৫৯ জন দস্যুর আত্মসমর্পণের পাশাপাশি ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ এবং ৭টি ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়েছে।
র্যাবের মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে নিশ্চিত করেন, লুণ্ঠিত অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধারে সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে।
৮ মাসে র্যাব-৬ এর উল্লেখযোগ্য অর্জন
র্যাব-৬ এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৮ মাসে খুলনার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ৬৩৪ জন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার এবং ৩৫ জন অপহৃত ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময়ে জব্দ করা হয়েছে:
অস্ত্র ও বিস্ফোরক: ৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১৯৫ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৩টি ম্যাগাজিন এবং ৮৪টি বোমা ও ককটেল।
বিপুল পরিমাণ মাদক: ১,৯৫৬ বোতল ফেনসিডিল, ৪২,০১৯ পিস ইয়াবা, ৩২৩.২ কেজি গাঁজা, ২৩৮.৮৪ লিটার দেশি মদ, ১,২৩৯ বোতল ফেয়াড্রিল, ১.৫১ কেজি বিপজ্জনক ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ৬,৯৯৫ বোতল ইসকাফ সিরাপ, ২২,৮২৪ পিস ট্যাপেন্টাডল, ১৫,২৯৮ বোতল উইনকেরিক্স এবং ৯৬ হাজার পিস পাতার বিড়ি।
লবণচরার জোড়া হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি সন্ত্রাসী আল আমিন ওরফে সাইফিকেও ঘটনার মাত্র দুই দিনের মধ্যে গোপালগঞ্জের মাঝিরগাতি এলাকা থেকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব।
তবুও আতঙ্ক কাটেনি নগরবাসীর
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক অভিযান, ভারী অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মধ্যেও সাধারণ নগরবাসীর মন থেকে ভয় ও শঙ্কা পুরোপুরি দূর হয়নি। প্রকাশ্যে অস্ত্রের ব্যবহার, গ্যাং কালচার ও গোপনে মাদকের বিস্তার নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন খুলনার সচেতন নাগরিক সমাজ।
নগরবাসীর আকুল আকুতি—র্যাব ও পুলিশের এই যৌথ সাঁড়াশি অভিযান যেন সাময়িক না হয়ে স্থায়ী রূপ পায়। অপরাধীদের রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয়স্থল পুরোপুরি ভেঙে দিয়ে খুলনাকে একটি শান্ত, নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য নগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার দাবি সকলের।