লেখক: রতন চন্দ্র সরকার
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে চা খাচ্ছিলাম আর একটা গল্পের বই পড়ছিলাম। হঠাৎ মা এসে বলল, মামা নাকি তাদের বাসায় ডেকেছেন। কিন্তু কেন ডেকেছেন তা জানেন না। তাই আর কথা না বাড়িয়ে বই পড়া বন্ধ করে মামাদের বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলাম।
সময়টা বর্ষাকাল। আকাশ মেঘলা, যখন-তখন বৃষ্টি নামতে পারে। বৃষ্টি নামার আগেই যেতে হবে, আবার আজই ফিরতে হবে। কারণ আগামীকাল আমার কোচিংয়ে পরীক্ষা আছে। তাই তাড়াহুড়ো করে ছোট ভাইকে সাইকেলটা বের করতে বললাম। সে বলল, সাইকেলে পাম্প নেই। বাজার থেকে আসার সময় সামনের চাকা লিক হয়েছে, কিন্তু সে ঠিক করেনি। সাইকেল ঠিক না করায় তাকে একটু বকাঝকা করে হেঁটেই রওনা দিলাম মামাদের বাসার উদ্দেশে।
আমাদের বাসা থেকে মামাদের বাসা বেশি দূরে নয়, তিন কিলোমিটারেরও কম। তাই আকাশ খারাপ থাকায় দ্রুত পা চালিয়ে চলতে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই মামাদের বাসায় পৌঁছালাম। মামার সাথে দেখা করলাম, ভালো-মন্দ কথা হলো। দিদিমার সাথেও কথা হলো, তিনি মা-বাবা ও ভাইয়ের খোঁজখবর নিলেন। এভাবেই কেটে গেল কিছুটা সময়। তারপর দুপুরে সবাই মিলে খাওয়া-দাওয়া করলাম।
এরপর মামা আমাকে যে কাজের জন্য ডেকেছেন, তা বললেন। দুই মামা-ভাগ্নে মিলে সেই কাজ সম্পন্ন করলাম। এর মধ্যেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। আমাকে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরতে হবে। কারণ একটু পরই সন্ধ্যা নামবে। আর আমাদের বাসায় যাওয়ার পথে মাঝরাস্তায় একটা নির্জন জঙ্গল ও একটা মড়া পোড়ানো শ্মশানের পাশ দিয়ে যেতে হয়। আমি জানি, অন্ধকারে একা ওই রাস্তা দিয়ে যেতে পারব না। কারণ আমি অনেক ভীতু। ভূতকে বিশ্বাস করি ও অনেক ভয় পাই। তাই তাড়াহুড়ো করে মামাদের বাসা থেকে বিদায় নিলাম।
কিছুদূর যাওয়ার পর টিপটিপ করে বৃষ্টি নামতে শুরু করল। ধীরে ধীরে বৃষ্টির গতি বাড়তে থাকল। তখন রাস্তার পাশে একটি ছোট দোকানে আশ্রয় নিলাম। বৃষ্টি না থামা পর্যন্ত সেখানেই থাকলাম। কিন্তু অবাক করা বিষয়, দোকানদার আমার সাথে একটিও কথা বলল না।
তারপর বৃষ্টি একটু কমল। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। তবুও ভয়ে ভয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। হাতে ছিল মোবাইল ফোন। সেই মোবাইলের নিভু নিভু আলোয় পথ চলতে থাকলাম। রাস্তায় একদম নির্জন, ছমছমে পরিবেশ। কোনো মানুষের চলাচল নেই। মাঝে মাঝে দূর কোথাও থেকে শিয়াল-কুকুরের হাঁক শোনা যায়।
আমি হাঁটছি, হঠাৎ দেখলাম আমার সামনে দিয়ে কিসের যেন একটা ছায়া দৌড়ে গেল। আমি চমকে উঠলাম। গায়ের প্রতিটি লোম দাঁড়িয়ে গেল। এদিক-সেদিক তাকালাম, কোথাও কিছু নেই। বুকে একদলা থুতু দিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। হাঁটার সময় মনে হচ্ছে, আমার পেছন পেছন কে যেন আসছে। কিন্তু পেছনে তাকালেই হাওয়া হয়ে যায়।
তখন হঠাৎ করেই আমার পায়ের ফাঁক দিয়ে কী যেন একটা দৌড়ে গেল, চোখগুলো দিয়ে আলো জ্বলছিল। এ দেখে তো আমার বেহুঁশ হওয়ার দশা। কিন্তু ম্যাও ম্যাও শব্দ করায় হুঁশ ফিরল— ওটা ভূত নয়, বিড়াল।
চারদিকে অন্ধকার, আমি তখন নির্জন রাস্তায় একা। মাঝে মাঝে আকাশে বাজ পড়ছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছে। আর আমি বৃষ্টিতে ভিজেই হেঁটে যাচ্ছি। মনের মাঝে তখন বিভিন্ন ভয়ের কথা মনে পড়ছিল। এসব ভাবতে না চাইলেও বারবার ভয়ের কথাই মনে হচ্ছিল। তখন প্রাণ যেন বের হয়ে যায়, এমন অবস্থা।
তবুও পথ চলছি, মাঝে মাঝে বাদুড়ের ডানা ঝটকানো এবং ঝিঁঝি পোকার শব্দ যেন আমাকে গ্রাস করে ফেলে। এর মাঝেই চোখ আটকে গেল— সামনে সাদা রঙের কী যেন একটা দাঁড়িয়ে আছে, হালকা নড়াচড়া করছে। বৃষ্টির মাঝেও আমার পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেল, পা আটকে গেল। না পারছি এগোতে, না পারছি পিছাতে। কী করব ভেবে পাচ্ছি না, গলা শুকিয়ে গেছে। হঠাৎ দেখি, সাদা জিনিসটা আমার দিকেই আসছে। আমি চিৎকার দেব, ঠিক এমন সময় মা দরজায় কড়া নাড়ছে—
“কি রে, আর কত ঘুমাবি? অনেক বেলা হয়েছে, ওঠ এখন, ফ্রেশ হয়ে পড়তে বস।”
তখন যেন আমার জীবন বের হয়ে আবার ভেতরে প্রবেশ করল। উঠে দেখি, আমি ঘেমে ভিজে একাকার। বালিশ, বিছানার চাদর আমার শরীরের ঘামে ভিজে গেছে। লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম, যাই হোক— এটা সত্যি নয়, এটা ছিল আমার কল্পনা আর দুঃস্বপ্ন।