খুলনা প্রতিনিধি:
একটি সাইকেল, বুকভরা স্বপ্ন আর প্রিয় মাতৃভূমিকে নতুন করে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা এই তিনকে সঙ্গী করে পথ চলেছেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের তরুণ আশরাফুল ইসলাম মুন্না। তার স্বপ্ন বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা সাইকেলে ঘুরে দেখা; কাছ থেকে অনুভব করা দেশের প্রকৃতি, মানুষ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈচিত্র্যময় রূপ।ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ উপজেলার রামজীবনপুর গ্রামের এই ২২ বছর বয়সী তরুণ ইতোমধ্যে সাইকেলে পাড়ি দিয়েছেন ৩১টি জেলা। দীর্ঘ পথের ক্লান্তিকে পেছনে ফেলে ২৬ আগস্ট ২০২৬, বুধবার তিনি পৌঁছান খুলনায়। খুলনায় এসে তার পথচলার একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে খুলনা আর্ট একাডেমি পরিদর্শন।শিল্পের আঙিনায় স্বপ্নবাজ এক তরুণের আগমন মুন্নার আগমনে খুলনা আর্ট একাডেমির শিল্পের আঙিনায় যেন যুক্ত হলো পথের আরেকটি জীবন্ত গল্প। খুলনা আর্ট একাডেমি পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস।এ সময় উপস্থিত ছিলেন খুলনা আর্ট একাডেমির সহকারী পরিচালক শিলা বিশ্বাস, সিপইয়ার্ড স্কুলের চারুকলা শিক্ষক সুব্রত কুমার মণ্ডল, শিক্ষার্থী চিরঞ্জিত মণ্ডল, শুভ সরকার, প্রান্তর গোলদার, প্রচার সম্পাদক সৌহার্দ্য বিশ্বাস, শিক্ষার্থী সম্প্রীতি বিশ্বাস, অয়ন চক্রবর্তী,আর্দ্রতা দে, তোয়া ও রিদা
সহ আরও অনেকে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘Munna Creation’ নামে পরিচিত আশরাফুল ইসলাম মুন্নার ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ষড়ঋতুর এই সবুজ-শ্যামল দেশের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বইয়ের পাতা বা পর্দায় নয় নিজের চোখে দেখা ও হৃদয়ে অনুভব করার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তার মনে জন্ম নেয় সাইকেলে দেশ ভ্রমণের স্বপ্ন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় সাইকেলে দেশ ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন মানুষের গল্প ও অভিজ্ঞতা তার সেই স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে। একসময় স্বপ্ন ও ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে ২৬ জুন ২০২৬ তিনি শুরু করেন সাইকেলে দেশভ্রমণের যাত্রা।ভ্রমণ নয়, দেশকে অনুভব করার যাত্রা মুন্নার এই পথচলা নিছক ভ্রমণের আনন্দের জন্য নয়। প্রতিটি জেলা তার কাছে বাংলাদেশের একটি নতুন অধ্যায়। কোথাও প্রকৃতির রূপ, কোথাও মানুষের সরলতা, কোথাও ইতিহাসের স্মৃতি, আবার কোথাও সংস্কৃতির নিজস্ব সৌন্দর্য সবকিছুকে কাছ থেকে অনুভব করাই তার উদ্দেশ্য।সৃষ্টিজগতের অপরূপ সৌন্দর্যের মধ্যে মহান স্রষ্টার নিদর্শন খুঁজে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও রয়েছে তার মনে। একই সঙ্গে দেশের তরুণ সমাজের কাছে তিনি একটি ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে চান। তরুণরা যেন মাদক ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকে, ভ্রমণের প্রতি আগ্রহী হয়, নিজের দেশকে জানে এবং দেশের মানুষ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলে এটাই তার প্রত্যাশা।বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণের পর একদিন বিশ্বের পথেও পা রাখার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণ।কৃষকের ঘর থেকে উঠে আসা এক স্বপ্নবাজ তরুণ মুন্নার গল্পের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক দিকগুলোর একটি হলো তার পারিবারিক পরিচয়। তিনি কোনো বিত্তবান পরিবারের সন্তান নন। সাধারণ কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ ২০২৪ সালে এইচএসসি পাস করেন।তার বাবা মো. ছারুয়ার জাহান একজন কৃষক এবং মা মোছা. আশিক নূর। তিন ভাইয়ের মধ্যে মুন্না সবার ছোট। পরিবারের ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও সাহসকে সঙ্গে নিয়েই তিনি শুরু করেছেন তার দীর্ঘ সাইকেলযাত্রা।খুলনা আর্ট একাডেমিতে স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা খুলনা আর্ট একাডেমিতে মুন্নার সঙ্গে তার অতীত, বর্তমান, স্বপ্ন, লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘ সময় কথা বলেন চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস। আলোচনায় উঠে আসে দেশ ও মানুষের প্রতি মুন্নার গভীর ভালোবাসা এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়।চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস বলেন,“একজন আদর্শ ও দেশপ্রেমিক মানুষ যে কেবল বিত্তবান পরিবার থেকেই উঠে আসে, তা নয়। সাধারণ একটি কৃষক পরিবারের সন্তানও দেশের জন্য বড় স্বপ্ন দেখতে পারে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে। আশরাফুল ইসলাম মুন্না তারই একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।”তিনি আরও বলেন, মুন্নার মতো তরুণদের স্বপ্ন ও ইতিবাচক কর্মকাণ্ড সমাজের সামনে তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। কারণ একটি তরুণ হৃদয়ের সুন্দর স্বপ্ন ও সাহসী উদ্যোগ অন্য অনেক তরুণের জীবনেও নতুন স্বপ্নের আলো জ্বালাতে পারে।পরিচয়ের সূত্রে খুলনায় আগমন মুন্নার খুলনা সফরের পেছনেও রয়েছে একটি সুন্দর পরিচয়ের গল্প। চন্দ্রবিন্দু প্রকাশন, বাংলাবাজার শাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চিত্রশিল্পী মোবারক হোসেন মাহি মুন্নার সঙ্গে চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের পরিচয় করিয়ে দেন।চারুকলার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সূত্রে গড়ে ওঠা এই পরিচয়ের মাধ্যমেই মিলন বিশ্বাস জানতে পারেন মুন্নার দেশভ্রমণের স্বপ্ন ও খুলনা সফরের ইচ্ছার কথা। পরবর্তীতে তাকে খুলনা আর্ট একাডেমিতে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং তার আগমনে ফুলেল শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানানো হয়। তারই সঙ্গে একটি ডায়েরি ও কলম ভ্রমণের বিষয় সম্পর্কে লেখার জন্য তার হাতে তুলে দেওয়া হয়।৩১ জেলা পেরিয়ে এখন ৬৪ জেলার পথে২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত মুন্না সাইকেলে যেসব জেলা ভ্রমণ করেছেন নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, সাতক্ষীরা ও খুলনা।৩১টি জেলা পেরিয়ে তার সাইকেল এখন ছুটছে বাকি জেলার পথে। প্রতিটি নতুন জেলা তার কাছে শুধু একটি গন্তব্য নয়; বাংলাদেশের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নতুন কোনো গল্পের দরজা।সরকারের প্রতি চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের আকুল আবেদন চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাস বলেন, মুন্নার এই ব্যতিক্রমী ও ইতিবাচক উদ্যোগকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও উৎসাহিত করা উচিত।তিনি সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়ে বলেন, মুন্না যখন ৬৪ জেলা সাইকেলে ভ্রমণের পথে ময়মনসিংহে পৌঁছাবে, তখন সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন ও উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক।তিনি বলেন,“মুন্নার মতো একজন সাধারণ কৃষক পরিবারের তরুণ যখন নিজের স্বপ্নকে শক্তিতে পরিণত করে সাইকেলে দেশের ৬৪ জেলা ঘুরে দেখার উদ্যোগ নেয়, তখন তার এই অর্জনকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা দরকার। তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করা হলে তার এই পথচলা আরও অনেক তরুণকে ভালো ও সৃজনশীল কিছু করার অনুপ্রেরণা দেবে।”চিত্রশিল্পী মিলন বিশ্বাসের প্রত্যাশা, মুন্নার এই উদ্যোগ দেশের তরুণদের মধ্যে দেশকে জানার, প্রকৃতিকে ভালোবাসার এবং ইতিবাচক কাজে নিজেদের যুক্ত করার নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করবে।পথ চলুক, পূর্ণ হোক স্বপ্ন একটি সাইকেলের চাকা ঘুরছে। তার সঙ্গে ঘুরছে এক তরুণের স্বপ্ন। সেই চাকার প্রতিটি ঘূর্ণনে যেন লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ভালোবাসার নতুন নতুন গল্প।দেশের মানুষের কাছে মুন্নার জন্য রইল আন্তরিক শুভকামনা। তার দীর্ঘ পথচলা হোক নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন। কোনো প্রতিকূলতা যেন তার স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।বাংলাদেশের ৬৪ জেলা সাইকেলে ঘুরে দেখার স্বপ্ন একদিন পূর্ণতার আলোয় উদ্ভাসিত হোক।
শুভ হোক তার পথচলা।
সফল হোক তার স্বপ্ন।
দেশকে জানুক তরুণ,
দেশকে ভালোবাসুক তরুণ।